1. admin@andolonerbazar.com : : admin admin
  2. andolonerbazar@gmail.com : AndolonerBazar :

কৃষির অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে দেশের অর্থনীতিতে নতুন ধারার সূচনা

  • সর্বশেষ আপডেট : রবিবার, ২৮ মে, ২০২৩

 

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কৃষকদের শ্রম, কৃষি সম্প্রসারণবিদদের তদারকি, কৃষি বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও সরকারের সদিচ্ছায় কৃষিতে রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি, গম দ্বিগুণ, সবজি পাঁচগুণ এবং ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে দশগুণ। আর এভাবেই প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এখন পাট উৎপাদন ও রপ্তানিতে বিশ্বে ১ম, কাঁঠাল উৎপাদনে ২য়, ধান উৎপাদনে টানা চারবার বিশ্বে ৩য়, সবজি ও পেঁয়াজ উৎপাদনে বিশ্বে ৩য়, আম ও আলু উৎপাদনে বিশ্বে ৭ম স্থানে রয়েছে। এছাড়া স্বাদু পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশ ৩য় স্থানে রয়েছে। চাষের মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের ৫ম অবস্থানে এবং ইলিশ উৎপাদনে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ এখন মাংস ও ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং দুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্তার দ্বারপ্রান্তে। আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এ সাফল্য এসেছে কৃষিক্ষেত্রে লাগসই জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং তার যথাযথ ব্যবহারে কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষক, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে। কৃষি আবহমান বাংলার আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও ঐতিহ্যের মূল চালিকাশক্তি। কৃষিকে ঘিরেই মানুষের সভ্যতার জাগরণ শুরু। গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন তথা স্বনিভর্রতা অর্জনে আবহমানকাল ধরে কৃষি খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের পুরোটাই জুড়ে ছিল কৃষি। স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশে ১৯৭২-৭৩ সালে রপ্তানি আয় ছিল মাত্র ৩৪৮.৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার ৯০ ভাগ আসত পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে। পরবর্তী সময়ে শিল্প ও বাণিজ্যসেবা খাতের উলে¬খযোগ্য বিকাশ ঘটলেও দীর্ঘকাল পর্যন্ত এগুলোও ছিল কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ফলে কৃষি হয়ে উঠেছে এ দেশের অর্থনীতির মূলভিত্তি। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বিনোদনের অধিকাংশ উপাদান আসে কৃষি থেকে। বিশেষ করে খাদ্য ছাড়া জীবন বাঁচানো যায় না। খাদ্যের একমাত্র উৎস কৃষি। কৃষি উৎপাদনে ও খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করছে। শুধু তাই নয়, কোভিড-১৯ উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেও খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রেখে বিশ্বে বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। মোট দেশজ উৎপাদনের হিসেবে জিডিপিতে এখন কৃষি খাতের অবদান শতকরা ১৩ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানে ৪১ শতাংশ। স্বাধীনতার ঠিক পরে ১৯৭২ সালে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছিল এক কোটি ১০ লাখ টন-যা সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। কিন্তু বর্তমানে ১৮ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশ হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমানে প্রতি বছর ধান, গম, ভুট্টা মিলিয়ে তিন কোটি ৮৮ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদন হচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে আয় হয়েছিল ১১৬ কোটি মার্কিন ডলার। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে আয় হয়েছে ৬২ কোটি ৩১ লাখ ৮০ হাজার ডলারের। জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান কমলেও অন্যান্য খাতের বিকাশে কৃষি সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনার এ সফলতায় কৃষির অবদান সবচেয়ে বেশি। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করায় বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে প্রচার করছে। সরকারের যুগোপযোগী নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দেশ দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্তা অর্জন করেছে। ফসলের পাশাপাশি প্রাণিজ আমিষ খাতেও ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। কৃষির উন্নয়ন ও কৃষকের কল্যাণকে সর্বোচ্চ বিবেচনায় এনে ‘রূপকল্প-২০৪১’-এর আলোকে জাতীয় কৃষিনীতি-২০১৮, নিরাপদ খাদ্য আইন,  টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০ এবং ডেল্টাপ¬্যান-২১০০ সহ উলে¬খযোগ্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে কৃষি খাতে বায়োটেকনোলজির ব্যবহার, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, সুষম সার ব্যবস্থাপনা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, বায়োফর্টিফিকেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খাদ্যোপাদান সমৃদ্ধ শস্য উৎপাদনে কৃষি মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া বন্যা, খরা, লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবনসহ জলবায়ু পরিবর্তন মোকিাবিলায় ভাসমান চাষ,  বৈচিত্র্যময় ফসল উৎপাদন, ট্রান্সজেনিক জাত উদ্ভাবন, পাটের জেনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন ও মেধাস্বত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে সরকার। খাদ্য সংরক্ষণ ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকদের কাছে থেকে সরাসরি ধান ক্রয় করে তাদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য প্রদান নিশ্চিত করার জন্য প্যাডি সাইলো ও স্টিল সাইলো নির্মাণের ব্যবস্থা করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। কৃষির উন্নয়নে কৃষকদের জন্য সার, বীজসহ সব কৃষি উপকরণের মূল্যহ্রাস, কৃষকদের সহজশর্তে ও স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা প্রদান, ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট  খোলার সুযোগসহ তাদের নগদ সহায়তা সরকারি সদিচ্ছার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতসহ কৃষি পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে উত্তম কৃষি চর্চা নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে পূর্বাচলে দুই একর জমিতে স্থাপন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের অ্যাক্রিডিটেড ল্যাব ও আধুনিক প্যাকিং হাউস। ধানের উৎপাদন না কমিয়েই আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে স্থানীয়ভাবে চাহিদার শতকরা ৪০ ভাগ তেল উৎপাদন করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। কৃষি শিক্ষা ও গবেষণা খাতে আরও বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে- যার ধারাবাহিকতায় খোরপোশের কৃষি আজ উৎপাদনমুখী ও বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। কৃষিকে ডিজিটাল করে আরো কৃষকবান্ধব করার জন্য সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন  বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এমনকি মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো এগিয়ে আসছে। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারের ডিজিটাল কর্মসূচির আওতায় ইন্টিগ্রেটেড ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাবে ক্লিক করলেই মিলছে কৃষি মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ ১৭টি দপ্তর/সংস্থার ৪৫টি নাগরিক সেবা। অধিক জনসংখ্যা আর কৃষি জমির ক্রমহ্রাসমান অবস্থার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা প্রতিকূলতা আমাদের কৃষির জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও বাড়তি জনসংখ্যার বসতবাড়ি নির্মাণে প্রতি বছর প্রায় ০.৭ শতাংশ হারে আবাদি জমি হ্রাস পাচ্ছে, অন্য দিকে প্রতি বছর জনসংখ্যা বাড়ছে ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ হারে প্রায় ২৩ লাখ। আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ হ্রাস পেলেও কৃষি বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল জাত, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকের শ্রমে কৃষিতে এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রত্যেক উপজেলায় ফসল সংরক্ষণাগার গড়ে তুলতে হবে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, জাতীয় কৃষিনীতি, জাতীয় বীজনীতি, জাতীয় খাদ্যনীতি ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য (এসডিজি)-এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দেশের জনগণের পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য নিরাপত্তা বিধানকল্পে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এড়ানোর জন্য নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পশ্চাৎপদ নৃ-গোষ্ঠীর জন্য পাহাড়ি অঞ্চলে ফলের বাগান সৃজন ও সবজি আবাদের বিস্তার এবং অনুন্নত চর ও হাওড় অঞ্চলে সমন্বিত কৃষি সহায়ক প্রকল্পসহ বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। রাজধানীসহ শহর এলাকাগুলোতে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য স্থায়ীভাবে খোলাবাজার চালু করা হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই উপকৃত হবেন। কৃষির বহুমুখীকরণের পাশাপাশি কৃষিজাত শিল্পকারখানা এবং উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চয়তা ক্রমে বাজার  ক্ষেত্র বিস্তৃত করার পাশাপাশি রবি শস্যসহ কৃষিজাত অন্যান্য পণ্য উৎপাদনে মনোযোগী এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে হবে। তাহলে কর্মসংস্থানের  ক্ষেত্র যেমন আরও বিস্তৃত হবে তেমনি রপ্তানি তালিকাও হবে দীর্ঘ। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য পরিবেশ সমুন্নত রেখে প্রযুক্তি ও ফসলের জাত উদ্ভাবনে অর্থনীতির নতুন এক প্রবৃদ্ধি দেখছে দেশবাসী। দানাদার শস্য, শাকসবজি, ফলমূল, মৎস্য, দুধ, ডিম উৎপাদনে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাফল্য বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ আজ দানাদার খাদ্যের উদ্বৃত্ত দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্যমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে বায়োটেক ও জিএম শস্যের প্রবর্তন ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। পাট ও ছত্রাকের সাতটি জিনের পেটেন্ট কাজে লাগিয়ে শিল্পের উপযোগী পাটপণ্য উৎপাদন করতে পারলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন ধারার সূচনা করবে। খাদ্য ও পুষ্টি সমৃদ্ধ নতুন নতুন জাত ও লাগসই প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং তা সম্প্রসারণে কৃষিবিজ্ঞানী, সম্প্রসারণ কর্মীসহ সংশি¬ষ্ট সবার নিরলস প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে। খাদ্য উৎপাদনের ধারা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা, পুষ্টিসম্পন্ন ফসল উৎপাদন, খাদ্যের অপচয় রোধ করে প্রতিটি মানুষের জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন ধারার সূচনা করবে।

লেখক ঃ কৃষিবিদ ডক্টর মো. আল-মামুন, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, প্রজনন বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা।

 

Please Share This Post in Your Social Media

আরো খবর
© All rights reserved ©2021  Daily Andoloner Bazar
Site Customized By NewsTech.Com