1. andolonerbazar@gmail.com : AndolonerBazar :
রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১০:০৬ অপরাহ্ন

কৃষি জমিতে জৈব ঘাটতি বাড়ছে

  • সর্বশেষ আপডেট : সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২
  • ৫৫ মোট ভিউ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ফসল উৎপাদন মাটির স্বাস্থ্যের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। মাটি হচ্ছে কৃষির মূল ভিত্তি। উর্বরা মাটি না হলে ভালো ফসল উৎপাদন হয় না। তাই সুষম মাটিতে ৫ শতাংশ জৈব উপাদান থাকার কথা। দেশের মোট আবাদি জমির সাড়ে ৮০ শতাংশে জৈব ঘাটতি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। উর্বরা শক্তি হারাচ্ছে মাটি। অধিকাংশ এলাকায় জৈব পদার্থের উপাদান এক শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে। এতে ভেঙে পড়ছে মাটির স্বাস্থ্য। দেশে আবাদি জমি, বনভূমি, নদী, লেক, বনাঞ্চল মিলিয়ে মোট জমির পরিমাণ এক কোটি ৪৭ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর। যার ৫৬ শতাংশ জমিতে ফসলের জন্য আবাদ করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৮০ ভাগ জমিতে জৈব উপাদানের ঘাটতি রয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, একই জমিতে যুগের পর যুগ একই ফসলের চাষ, জমিকে বিশ্রাম না দেওয়া, রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এক দশক আগেও জমিতে দুই থেকে তিন ধরনের সার ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে সব মিলিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে অন্তত ১৭ ধরনের সার। একেকটি ফসল উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে ৮ থেকে ৯ ধরনের সার ও কীটনাশক। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণত ৪৫ শতাংশ খনিজ বা মাটির কণা, ৫ শতাংশ জৈব এবং ২৫ শতাংশ করে পানি ও বাতাস থাকা মাটিকে সুষম মাটি বলা হয়। একটি আদর্শ জমিতে জৈব পদার্থের মাত্রা ৩.৫ শতাংশ থাকা অতি প্রয়োজনীয় হলেও দেশের বেশির ভাগ জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ এক দশমিক ১৭ শতাংশ। কিছু কিছু জমিতে এর পরিমাণ ১ শতাংশের চেয়েও কম; এর মধ্যে ৫৪ লাখ হেক্টর জমিতে ফসফরাস, ২৬ দশমিক ৩০ লাখ হেক্টর জমিতে পটাশিয়াম, ৩৩ দশমিক ৩০ লাখ ৮ হাজার হেক্টর জমিতে গন্ধক, ২৭ দশমিক ৭ লাখ হেক্টর জমিতে দস্তা সার, ২৩ দশমিক ৯ লাখ হেক্টর জমিতে বোরন সারের অভাব রয়েছে। এছাড়া অনেক জমিতে রয়েছে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের অভাব। মাটির পুষ্টি উপাদান হ্রাস, মাটিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি, মাটির অম্লতা বৃদ্ধি, ভূমিক্ষয়, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ভারী ধাতুদূষণ ইত্যাদি ভূমির অবক্ষয়ের প্রধান কারণ। একদিকে জনসংখ্যার চাপ, সম্পদের সীমাবদ্ধতা, খাদ্য নিরাপত্তা, জলাবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ইত্যাদি এখন দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বাড়তি খাদ্য চাহিদা মেটাতে গিয়ে জমিতে বর্তমানে তিন থেকে চারবার একই ধরনের ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে। আবাদ করা হচ্ছে, উচ্চফলনশীল অথবা হাইব্রিড জাতের ফসল। এসব ফসল মাটি থেকে বিপুল পরিমাণ পুষ্টি উপাদান শোষণ করছে। উপরিভাগের উর্বর মাটি ব্যবহার হচ্ছে ইটভাটা ও উন্নয়ন কাজে। ফলে জমি হারাচ্ছে স্বাভাবিক উৎপাদনক্ষমতা। কাজেই মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতি জরুরি। মাটিতে বিনিয়োগ অত্যন্ত লাভজনক। মাটিতে এক মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করলে পাঁচ মার্কিন ডলার প্রতিদান পাওয়া যায়। মাটি সুরক্ষায় সমন্বিতভাবে কাজ করছে পরিবেশ অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনিস্টিটিউট, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সিইজিআইএস। এসব প্রতিষ্ঠানের এক যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। এখানে প্রতিবর্গ কিলোমিটারে প্রায় এক হাজার ২শ’ জন বসবাস করে যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা (যা বর্তমানে প্রায় সাড়ে চার কোটি টন) দাঁড়িয়েছে। আগামী ৫০ সালে ক্রমবর্ধমান এই জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুনের বেশি করতে হবে। বাংলাদেশে নিট ফসলি জমি এক কোটি ৯৬ হাজার একর। যা আগামী দিনের খাদ্য উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশে শস্যের একর প্রতি উৎপাদন অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। তাছাড়া নতুন ঘরবাড়ি, শিল্প প্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাট তৈরি, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ অন্যান্য কাজে আবাদযোগ্য জমি বছরে প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর কমে যাচ্ছে। পুষ্টিবিদরা বলছেন, মাটিতে জৈব উপাদানের ঘাটতি হলে মানুষের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। কারণ মাটির গুণাগুণ কমে গেলে ফসল উৎপাদন করতে গিয়ে বেশি পরিমাণে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। এর ফলে ফসলের খাদ্যগুণ যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি এগুলো খাবারের মাধ্যমে মানুষের দেহেও প্রবেশ করছে। জৈব উপাদানকে মাটির প্রাণ বলে অভিহিত করেন কৃষিবিদরা। তাদের মতে, মাটিতে যেসব পচনশীল দ্রব্য বা উপাদান থাকে- যা বেশি পরিমাণে গাছ ও উদ্ভিদ শোষণ করে থাকে। সেগুলোকেই জৈব উপাদান বলা হয়। তবে এর মধ্যে অনেক ক্ষুদ্র অণু উপাদানও রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নানা ধরনের অণুজীব। কৃষিবিদ আব্দুস সাত্তার বলেন, জৈব উপাদানের ওপর মাটির জৈব ও রাসায়নিক গঠন নির্ভর করে এবং এটি মাটির পরিবর্তনের সঙ্গেও জড়িত। জৈব পদার্থ বেড়ে গেলে মাটির টেক্সচার, স্ট্রাকচার ভালো হয়। মাইক্রো অর্গানিজম অ্যাক্টিভ হয় যেটা গাছের জন্য জরুরি। তবে জমির উপরিভাগের মাটি কেটে ফেলা এবং ফসল উৎপাদনে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের মতো নানা কারণে এটি কমে যেতে পারে। আবহাওয়া উষ্ণ হলে মাইক্রোঅর্গানিজম সক্রিয় হয়, জৈব উপাদানকে ভেঙে ফেলে। আবার জমিতে যে পরিমাণ জৈবসার দেয়ার কথা, সেটি দেয়া হয় না। আগে ধানের খর জমিতে পচতে দেয়া হলেও এখনো সেই সুযোগ দেয় না কৃষকরা। শুরু হয় নতুন ফসল বোনা। এছাড়া নিবিড় চাষাবাদ পদ্ধতিতে একই জমিতে কোনো ধরনের বিরতি না দিয়ে বারবার চাষ করাটাও জৈব উপাদান কমাতে ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জৈব উপাদান মাটির উর্বরতা ধরে রাখে। মাটির ভৌতিক ও রাসায়নিক অবস্থা উন্নয়নের জন্য জৈব পদার্থের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি উদ্ভিদের খাদ্যোপাদান সরবরাহ, মাটির অম্ল ও ক্ষারত্বের তারতম্য রক্ষা এবং রাসায়নিক কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে। তাই জমিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ গোবর সার, কম্পোস্ট, খামারজাত সার ইত্যাদি প্রয়োগ করে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের প্রচেষ্টা নেয়া উচিত। সবুজ সার ও বিভিন্ন ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটিতে মিশিয়ে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করা যেতে পারে। আদর্শ মাটিতে কমপক্ষে ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকা উচিত। কিন্তু আমাদের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ খুবই কম। সুতরাং যত বেশি পারা যায় জমিতে জৈবসার প্রয়োগ করতে হবে। জমিতে প্রতি বছর একই ফসল বা একই ধরনের ফসলের চাষ করলে একটি নির্দিষ্ট স্তরের নির্দিষ্ট পুষ্টি, উপাদান নিঃশোষিত হয়ে উর্বরতা বিনষ্ট হয়। বিভিন্ন ধরনের ফসল মাটি থেকে অধিক পরিমাণ নাইট্রোজেন গ্রহণ করে। ফলে মাটিতে দ্রুত এর অভাব দেখা দেয়। জমিতে মাঝে মধ্যে ডাল জাতীয় ফসলের চাষ করে এ ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ করা যায়। কারণ এগুলো শিকড়ে রাইজোবিয়াম নামক ব্যাকটোরিয়া বসবাস করে এবং বায়ু থেকে নাইট্রোজেন আহরণপূর্বক গুটিতে সঞ্চয় করে ও পরিণামে মাটির উর্বরতা বাড়ায়। দীর্ঘদিন ধরে কোনোরূপ বিশ্রাম ছাড়া নিবিড় চাষাবাদ করা হলে মাটির ভৌত রাসায়নিক ও জৈব গুণাবলির অবনতি ঘটে। তাই কয়েক বছর পর অন্তত এক মৌসুমের জন্য জমি পতিত রেখে বিশ্রাম দেয়া প্রয়োজন। অবশ্য এ সময়ে জমিতে সবুজ সারের চাষ বা নিয়মিত পশু চারণের ব্যবস্থা করলে ভূমির উর্বরতা আরও বৃদ্ধি পায়। ত্র“টিপূর্ণ চাষাবাদ পদ্ধতি মাটির উর্বরতা বিনষ্ট করে। কিন্তু উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ করে ভূমির উবর্রতা সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা সম্ভব। সুষ্ঠু সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে মাঠের উবর্রতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই জমিতে পরিমিত সেচ দেয়া ও অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা একান্ত প্রয়োজন। মাটিতে অনেক সময় ক্ষতিকর রোগ ও কীটের জীবাণু বা ডিম থাকে এবং ফসল উৎপাদনকালে সেগুলো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। পর্যায়ক্রমে উল্টিয়ে পাল্টিয়ে জমি চাষ করলে এবং মাটি রোদে শুকিয়ে নিলে সেগুলো বিনষ্ট হয়ে যায় এবং মাটির উন্নয়ন সাধিত হয়। প্রয়োজনে সঠিক সময়ে সঠিক কৌশলে উপযুক্ত বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে।
লেখক ঃ ম ইমরান সিদ্দিকী

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো খবর
© All rights reserved ©2021  Daily Andoloner Bazar
Theme Customized By Uttoron Host

You cannot copy content of this page