1. andolonerbazar@gmail.com : AndolonerBazar :
বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২, ০২:০৫ অপরাহ্ন

ধানভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতি রূপান্তরে ব্রি’র অবদান

  • সর্বশেষ আপডেট : সোমবার, ২০ জুন, ২০২২
  • ১৪ মোট ভিউ

 

কৃষি প্রতিবেদক ॥  বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্তরণের ভিত্তি হচ্ছে কৃষি। কৃষি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়ায় দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রধান পেশা কৃষি এবং বেশির ভাগ মানুষ তাদের জীবিকা ও কর্মসংস্থানের জন্য কৃষির ওপর নিভর্রশীল। কৃষিভিত্তিক শিল্পে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং প্রণোদনা গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ এবং শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশ এখনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশের কথা এলে প্রথমেই আসে খাদ্য নিরাপত্তার কথা। আর খাদ্যশস্য বলতে আমরা ধানকেই বুঝে থাকি। ধান এ দেশের মানুষের জীবনাচরণ, খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। খাদ্য নিরাপত্তা বলতে চাল বা ভাতের নিরাপত্তাকে বুঝায়। মানুষের ক্যালরির চাহিদার সিংহভাগ আসে ভাত থেকে।

দেশে বছরে মাথাপিছু চালের চাহিদা ১৩৪ কেজি। এছাড়া চাল থেকে তৈরি বিভিন্ন ধরনের খাবার রয়েছে- যা বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগণের দৈনিক ক্যালরির চাহিদা পূরণ করে। তাই বিনা দ্বিধায় বলা যায় ধানই বাংলাদেশের প্রাণ। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং পুষ্টি নিরাপত্তার অর্জনের জন্য আধুনিক ধানের জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি ধান উৎপাদন প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের দারিদ্র্য বিমোচন এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নতির ক্ষেত্রে উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ১৯৭০ সালের ১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বা ব্রি।

টেকসই খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে ব্রি এ পর্যন্ত ৭টি হাইব্রিড ও ১০১টি ইনব্রিড জাতসহ  মোট ১০৮টি জাত উদ্ভাবন করেছে। খাদ্য নিরাপত্তাকে টেকসই করার জন্য বিভিন্ন ঘাত সহনশীল ও স্থানভিত্তিক জাত উদ্ভাবনে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। গত তেরো বছরে ব্রি উদ্ভাবিত জাতগুলোর প্রতিটিই বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। যেমন- খরা, বন্যা, লবণ সহিষ্ণু, জিংকসমৃদ্ধ, প্রিমিয়াম কোয়ালিটি, ডায়াবেটিক রাইসসহ অধিক উচ্চফলনশীল। পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রভাব  মোকাবিলায় ব্রি এখন পর্যন্ত ১২টি লবণ সহিষ্ণু, ৩টি খরা সহনশীল, ৩টি বন্যা সহনশীল রয়েছে।

ব্রি উদ্ভাবিত লবণাক্ততা সহনশীল জাতগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের মোট লবণাক্ত এলাকার প্রায় ৩৫ ভাগ ধান চাষের আওতায় এসেছে এবং এ থেকে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। খরাপ্রবণ এলাকায় খরাসহিষ্ণু জাতগুলো সম্প্রারণের মাধ্যমে ১২ শতাংশ আবাদ এলাকা বৃদ্ধি পেয়েছে যেখান থেকে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। জলমগ্নতা সহনশীল জাতগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২৬ শতাংশ এলাকা চাষের আওতায় এসেছে  যেখানে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। উপকূলীয় এলাকায় ধানের আবাদ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে উদ্ভাবিত জোয়ার-ভাটা

সহনশীল জাত (ব্রি ধান৭৬, ৭৭) সম্প্রসারণের ফলে প্রায় ৫৭ হাজার হেক্টর জমি এই ধান চাষের আওতায় এসেছে। সর্বোপরি, ২০২০-২১ সালে উচ্চ ফলনশীল ধানের জাতসমূহ  দেশের শতকরা ৮০ ভাগ জমিতে চাষ করা হয়েছে এবং এ থেকে পাওয়া গেছে দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৯১ ভাগ। ঘাত সহনশীল ও অনুকূল পরিবেশ উপযোগী জাতগুলোর আবাদ সম্প্রসারণের ফলে ২০১০-২১ পর্যন্ত ৬ লাখ টন হারে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত রয়েছে।

ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয় এবং গড় ফলনের হিসাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রথম। স্বাধীনতার পর আমাদের জাতীয় জীবনে অন্যতম অসামান্য অর্জন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। এই অর্জনের পেছনে রয়েছে দেশের বিজ্ঞানীদের প্রতি জাতির জনকের সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনা, বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি, ধান বিজ্ঞানীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং কৃষকের নিরলস পরিশ্রম। এই অসামান্য অর্জন সম্ভব হয়েছে প্রধানত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত ও আনুষঙ্গিক লাগসই চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কৃষক পর্যায়ে এসব প্রযুক্তি প্রয়োগের ফলে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের মানুষের জীবন-জীবিকার উলেস্নখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় থাকা মানুষ এখন টেলিভিশন,  মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেটের মতো উন্নত সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করে। ক্রমবর্ধমান ধান উৎপাদনের মাধ্যমে ক্ষুধা মেটানো এ ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যেখানে ব্রির একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। বর্তমানে দেশে খাদ্য আমদানি হ্রাস পাওয়ায় সঞ্চিত অর্থ দিয়ে সরকার দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ডে অবদান রাখছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়ছে।

ধানভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তরের মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ব্রি গত ৫০ বছরে এ পর্যন্ত ২৫টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া ২০২০ সালের  গ্লোবাল  গো টু থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সূচক রিপোর্টে ব্রিক দক্ষিণ এশিয়ায় সেরা (১ম অবস্থান), এশিয়ায় ২য় এবং বিশ্বের ১৬তম গবেষণা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বর্তমান সরকার  ঘোষিত আসন্ন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, এসডিজি-২০৩০, ভিশন-২০৪১, ডেল্টা পান-২১০০ সহ সব মাইলফলক অর্জনে ব্রি অতীতের ন্যায় ভবিষ্যতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনে কাজ করে যাবে।

লেখক ঃ ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো খবর
© All rights reserved ©2021  Daily Andoloner Bazar
Theme Customized By Uttoron Host
You cannot copy content of this page