1. admin@andolonerbazar.com : : admin admin
  2. andolonerbazar@gmail.com : AndolonerBazar :

পুষ্টি চাহিদা এবং খাদ্য নিরাপত্তায় কাঁঠাল

  • সর্বশেষ আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ, ২০২৩

কৃষি প্রতিবেদক ॥ সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এ ফলটি মানুষ মন ভরে এবং পেট পুরে খেতে পারে। কাঁঠালের মোট ওজনের প্রায় শতকরা ৫০-৬০ ভাগ মানুষের খাদ্য। দেখা যায় যে, ৫ কেজি ওজনের একটা কাঁঠালে সাধারণত আধাকেজি বীজ এবং আড়াই কেজি ওজনের পাল্প হয়ে থাকে। এতে গড়ে ১০০টি কোষ বা কোয়া পাওয়া যায়। একটা কোষের গড় ওজন প্রায় ২৫ গ্রাম। একজন মানুষ চার-পাঁচটা কোষ খেয়ে সহজেই দৈনিক ফলের চাহিদা মিটাতে পারে। বড় কাঁঠাল শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। কাঁঠালের কোনো অংশ ফেলে দেবার নয়। পাকা কাঁঠালের কোষ মানুষ সরাসরি খেয়ে থাকে অথবা প্রক্রিয়াজাতকরণ করে চিপস, ক্যান্ডি, জ্যাম, জেলি, আচার ইত্যাদি তৈরি করে খেয়ে থাকে। কাঁচা কাঁঠাল সবজি হিসেবে খাওয়া যায়। এটা ভেজিটেবল মিট হিসেবে পরিচিত। এর বীজ উৎকৃষ্ট মানের তরকারি। একে ভেজেও খাওয়া যায়। কাঁঠালের বীজ অনেক দিন সংরক্ষণ করে খাওয়া যায়। এজন্য মাটির পাত্রে বালুর মধ্যে বীজ রাখা হয়। বীজের ওপরের ছাল ছাড়িয়ে কাপড়ে ঘষা দিয়ে উষ্ণ গরম পানিতে ৫ মিনিট ডুবিয়ে রেখে ডিপ ফ্রিজে কয়েক মাস সংরক্ষণ করা যায় এবং তরকারিতে ব্যবহার করা যায়। কাঁঠালের ওপরিভাগ তথা চামড়া এবং অন্যান্য অংশ পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর পাতা ছাগলের খাদ্য হিসেবে সমাদৃত।
বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। এটা সাধারণত অযতেœ চাষ হয়ে থাকে অর্থাৎ কোনো রকম পরিচর্যা ছাড়াই ফল দিয়ে থাকে। তাই কাঁঠাল জৈব উপায়ে উৎপাদিত ফল বা অরগানিক ফুড। দেশে কাঁঠালের প্রতিটি গাছই আলাদা। অন্যান্য ফলের মতো এর সম্প্রসারিত কোনো জনপ্রিয় জাত বা কালটিভার নেই। তাই চাহিদামতো কাঙ্খিত অধিক পরিমাণ কাঁঠাল পাওয়া যায় না। বাগান আকারে কাঁঠালের চাষ বেশি না হলেও বসতবাড়ির আঙিনায়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চত্বরে, রেললাইন ও রাস্তার ধারে, ক্ষেতের আইলে তথা অব্যবহৃত স্থানে বাংলাদেশের সর্বত্রই কাঁঠালের চাষ হয়ে থাকে। ফলের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে এবং খাদ্য নিরাপত্তায় কাঁঠাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। খাদ্য নিরাপত্তার তিনটি মূল বিষয় হলো-এর প্রাচুর্য, মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকা এবং পুষ্টির সরবরাহ বজায় থাকা। তাই এককভাবে কাঁঠাল খাদ্য নিরাপত্তা বিধানে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে অর্থাৎ মৌসুমে এর প্রাচুর্য থাকে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে এবং পুষ্টির চাহিদা মেটাতে উল্লেখযোগ্য হারে ভিটামিন, খনিজ এবং শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। এর উচ্চমাত্রার ক্যারোটিন যা পরবর্তীতে শরীরে ভিটামিন এ তে পরিবর্তিত হয়ে রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকম কাঁঠাল পাওয়া যায়। তার নামকরণ এলাকাভিত্তিক ভিন্ন হয়ে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় লাল রঙের কোষসমৃদ্ধ কাঁঠাল পাওয়া যায় যাকে বিন্নী কাঁঠাল বলে। গাজীপুরে এক রকম আগাম কাঁঠাল পাওয়া যায় যার একটি ভিন্ন গন্ধ থাকে তাকে কুবাইরা কাঁঠাল বলে। রসালো সুস্বাদু কাঁঠালকে মধু কাঁঠাল বলা হয়। আবার এ অঞ্চলের মানুষ ৪০-৫০ কেজি ওজনের বড় কাঁঠালকে পাহাড়িয়া কাঁঠাল নামে অভিহিত করে থাকে।
কাঁঠালের প্রাপ্যতার সময়ের ওপর ভিত্তি করে কয়েক প্রকার হয়ে থাকে যথা-মৌসুমি কাঁঠাল (জুন-জুলাই মাসে পাকে), অমৌসুমি কাঁঠাল (অক্টোবরের পরে এবং মে মাসের আগে যেকোনো সময় পাকে), নাবী কাঁঠাল যা মৌসুমের পরে পাকে অর্থাৎ আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া যায়। এছাড়া কিছু কাঁঠাল বছরে দুইবার ফল দেয়, যা দোফলা নামে পরিচিত, একবার মৌসুমে এবং আরেকবার অমৌসুমে; যেসব কাঁঠাল গাছে বছরে কমপক্ষে ৮-৯ মাস ফল দেয় তাকে বারোমাসি কাঁঠাল বলে অভিহিত করা হয়।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল বিভাগ কাঁঠালের জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি উপযুক্ত অঙ্গজ বংশবিস্তার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে এবং এ পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করে কৃষকের মাঝে তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। ইতোমধ্যে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে ‘বারি উদ্ভাবিত বারোমাসি কাঁঠালের জাত বিস্তার’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে গাজীপুর, খাগড়াছড়ি, নরসিংদী ও ময়মনসিংহ জেলার চারটি উপজেলায় পঁচিশ থেকে ত্রিশজন কৃষকের বাড়ির আঙিনায় প্রতিটি জাতের ৫টি করে গ্রাফটিং এর চারা দিয়ে ১২০টি মাতৃবাগান সৃষ্টি করা হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল গবেষণা মাঠে স্থাপিত বাগানে সাড়ে তিন বছরের তিনটি জাতের গাছেই ফল ধরেছে। দেশি কাঁঠালের এ রকম বাগানে কয়েকটি গাছে এই প্রথম একই রকম ফল ধরেছে। গাজীপুরের কৃষকের বাগানেও ফল ধরেছে। এই বাগানগুলো এখন মাতৃবাগান হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। আশা করা যায় এসব বাগান থেকে দেশে কাঁঠালের উন্নয়ন শুরু হবে। কাঁঠালের সংগ্রহকাল সীমিত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কাঁঠালের সংগ্রহকালীন সময় কিছুটা ভিন্ন হতে দেখা যায়।
কাঁঠালের সংগ্রহকাল সাধারণত জুন-জুলাই মাসে সীমাবদ্ধ থাকে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রায় অধিকাংশ কাঁঠাল সংগ্রহ হয়ে থাকে। এই সময়ে কাঁঠালের স্বল্পমূল্য থাকে। পরিবহনজনিত খরচ কমানোর জন্য বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল ট্রাকে, বাসে এবং ভ্যানে একই সাথে গাদাগাদি করে একস্থান থেকে অন্যস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এতে আঘাতজনিত কারণে কাঁঠালের অনেকাংশই নষ্ট হয়ে থাকে। তাই একদিকে কৃষক যেমন মূল্য পায় না, অন্যদিকে ভোক্তাদেরও পর্যাপ্ত ভাল কাঁঠালের সরবরাহ বিঘিœত হয়। এই অপচয়ের কারণে আমাদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই পরিবহনের সময় নির্দিষ্ট এবং সীমিত সংখ্যক ফল একটা গাড়িতে বহন করে কাঁঠালের নষ্ট হয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করা যায়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল তথা কার্টন ব্যবহার করা যেতে পারে। কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে জ্যাম, জেলি, ক্যান্ডি, চিপস্ তৈরি করে দীর্ঘ দিন ব্যবহার করা যায়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা উন্নত গুণসম্পন্ন অধিক ফলনশীল মৌসুমি, অমৌসুম, আগাম ও বারোমাসি কাঁঠালের জার্মপ্লাজম বা গাছ শনাক্ত করে মূল্যায়নের মাধ্যমে জাত উদ্ভাবন করতে হবে এবং তা সম্প্রসারণ করে দেশে সমগুণসম্পন্ন কাঁঠাল প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
লেখক : ড. মোঃ জিল্লুর রহমান প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফল বিভাগ, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর।

Please Share This Post in Your Social Media

আরো খবর
© All rights reserved ©2021  Daily Andoloner Bazar
Site Customized By NewsTech.Com