1. admin@andolonerbazar.com : : admin admin
  2. andolonerbazar@gmail.com : AndolonerBazar :
শিরোনাম :

মানব চিকিৎসায় পাটের ব্যবহার

  • সর্বশেষ আপডেট : শুক্রবার, ৫ মে, ২০২৩

 

কৃষি প্রতিবেদক ॥ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার পাটকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য পাটজাত পণ্যকে ২০২৩ সালের বর্ষপণ্য এবং পাটকে কৃষিপণ্য হিসেবে গণ্য করার  ঘোষণা দিয়েছে। পাট উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ২য় হলেও পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ ১ম স্থান দখল করে আছে। পাট হলো একটি প্রাকৃতিক আঁশ, যার পরিবেশগত অনেক সুবিধা আছে।

চিকিৎসায় পাটের ব্যবহার ঃ গাছ মানুষ ও প্রাণীর পুষ্টি এবং অন্য স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদান করে। বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় আশি শতাংশ তাদের ওষুধের প্রাথমিক উৎস হিসেবে প্রাকৃতিক পণ্য এবং উদ্ভিদ ভিত্তিক ওষুধের ওপর নির্ভর করে এবং সমস্ত ওষুধের প্রায় পঁচিশ শতাংশ, বিভিন্ন প্রজাতির পাঁচশ ভেষজ উদ্ভিদ থেকে প্রাপ্ত। স্বাস্থ্যসেবার ক্রমবর্ধমান খরচ, সেইসঙ্গে উচ্চমূল্য এবং কিছু রোগের চিকিৎসায় মূলধারার ওষুধের ব্যর্থতার কারণে রোগ প্রতিরোধে ঐতিহ্যগত ওষুধের ব্যবহার বেড়েছে। তাই  বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায় বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার জন্য আরও স্থিতিশীল এবং কার্যকরী ওষুধ বিকাশের জন্য বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে অনুসন্ধান করে আসছে।

পাট পাতা ওষুধে ব্যবহারের একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। মানুষের বিভিন্ন ধরনের  রোগের চিকিৎসার জন্য আয়ুর্বেদিক ওষুধ হিসেবে পাটের ঐতিহ্যগত ব্যবহার আছে। পাটের ভোজ্য প্রজাতির পাতা প্রোটিন, ভিটামিন এবং খনিজ সমৃদ্ধ। পাটের মূল হলো ফাইটোমেডিসিনের একটি শক্তিশালী উৎস, যা কার্যকরভাবে কিছু নির্দিষ্ট  রোগের সঙ্গে যুক্ত প্রদাহ এবং পাইরেক্সিয়ার চিকিৎসায় কাজ করে। মাইক্রো এবং ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট ছাড়াও এতে বিস্তৃত বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ আছে, যেমন- গ্লাইকোসাইড, ফেনোলিক্স, ফ্ল্যাভোনয়েড, ট্যানিন, স্যাপোনিন, স্টেরল, ট্রাইটারপেনয়েডস, পোর্ট হাইড্রোম এবং এফএএসি।

পদার্থগুলোতে শক্তিশালী অ্যান্টিপাইরাটিক, মূত্রবর্ধক, ব্যথানাশক, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি, অ্যান্টিফাঙ্গাল, গ্যাস্ট্রোপ্রোটেকটিভ, অ্যান্টিনোসাইসেপটিভ, অ্যানালজেসিক, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল এবং অ্যান্টিটিউমারের ক্রিয়াকলাপের বৈশিষ্ট্য আছে। অধিকন্তু এ পদার্থগুলো আলফা-গ্লুকোসিডেস এবং আলফা-অ্যামাইলেজ ক্রিয়াকলাপকে বাধা দেয় এবং লিভারে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হ্রাস ও বিটা-অক্সিডেশন বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা পাটের বীজে পাওয়া বিরল প্রজাতির এন্ডোফাইট ব্যাকটেরিয়ার (স্টাফাইলোকক্কাস হোমিনিস) জিনোম সিকোয়েন্সিং করে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেছেন। গবেষণা অনুসারে, ওই ব্যাকটেরিয়া থেকে কমপক্ষে পাঁচটি অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করা যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা এ অভিনব অ্যান্টিবায়োটিককে হোমিকরসিন নামে নামকরণ করেছে এবং এই অ্যান্টিবায়োটিক বিভিন্ন ওষুধ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা আছে।

অ্যান্টিটিউমার এবং অ্যান্টিক্যান্সার কার্যকলাপ ঃ পাটের পাতায় ফাইটোল (ক্লোরোফিলের একটি পার্শ্ব শৃঙ্খল) নামক সক্রিয় উপাদান এবং মনো-গ্যালাক্টোসিল্ডি, অ্যাসিলগ্লিসারল শনাক্ত করা হয়েছে। ফাইটোল এবং মনো-গ্যালাক্টোসিল্ডি গ্লিসারল যথাক্রমে এপস্টাইন-বার (ইবি) ভাইরাসের প্রাথমিক অ্যান্টিজেনকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করে। পাটের জলীয় নির্যাসে ক্যানসার কেমো-প্রতিরোধক এজেন্ট আছে। তাই এটি হতে পারে একটি প্রধান যৌগগুলোর উৎস।  যে টিউমার প্রতিরোধী ক্রিয়াকলাপে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে।

গ্যাস্ট্রোপ্রোটেক্টিভ প্রভাব ঃ পেপটিক আলসার হলো গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ট্র্যাক্টের একটি এলাকার একটি আলসার, যা অতিরিক্ত অ্যাসিড, মিউকোসাল ডিফেন্সকে  ভেঙে ফেলে। পাটের পাতার একটি নির্যাস এনজিওজেনেসিস, কোষের বিস্তার এবং গ্রানুলেশন টিস্যুর পরিপক্কতা বাড়িয়ে আলসার নিরাময়কে ত্বরান্বিত করতে পারে। এছাড়া গ্যাস্ট্রিকের গতিশীলতা হ্রাস করে গ্যাস্ট্রিক প্রাচীরের ক্ষতস্থানের ক্ষেত্রফল এবং এডিমা বা শোথের অনুপ্রবেশ হ্রাস করার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্রিয়াকলাপ ঃ আমাদের দেহের মধ্যে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ার কারণে মুক্ত (ফ্রি) র‌্যাডিক্যালগুলো প্রচুর পরিমাণে তৈরি হয়। স্বাভাবিক বিপাকীয় প্রক্রিয়ায়, মুক্ত র‌্যাডিক্যাল জীবিত কোষের ভেতরে এবং বাইরের বিভিন্ন জৈবিক যৌগের সাথে তাদের মিথস্ক্রিয়ার ফলে রোগগত পরিবর্তন ঘটায়। ডায়াবেটিস, কার্ডিওভাসকুলার  রোগ এবং ক্যানসারের মতো অক্সিডেটিভ স্ট্রেস-সম্পর্কিত রোগের ঝুঁকি কমাতে  দেখা গেছে যে, পাটের পাতায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতার উচ্চ মাত্রা রয়েছে।

হৃদরোগ (কার্ডিওভাসকুলার) ক্রিয়াকলাপ ঃ হৃদরোগের জন্য পাটশাক খুব উপকারী। পাট শাকে থাকা খাদ্য উপাদান মানব শরীরের রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে। যার ফলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।  পাটের বীজ কর্কোর্টক্সিন (স্ট্রোফ্যানথিডিন) কার্ডিয়াক কার্যকলাপ প্রদর্শন করে। কার্ডিয়াক সমস্যায় ব্যবহৃত সবচেয়ে সক্রিয় ওষুধ হলো অলিটোরিসাইড এবং কর্কোরিসাইড, যা পাট থেকে পাওয়া গেছে।

কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় ঃ গবেষণায় দেখা গেছে, তামা শরীরের খারাপ  কোলেস্টেরল কমাতে এবং ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। পাট পাতায় ০.২২২ মিলিগ্রাম তামা থাকে।

ক্যানসার ঃ ক্যানসার প্রতিরোধে পাট শাক কার্যকরী। পাট পাতায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকার কারণে শরীর থেকে টক্সিন মুক্ত করে রাখে। ফলে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসে। পাট পাতায় ভিটামিন বি৯ (৯০ মাইক্রোগ্রাম) রয়েছে। এটি একাই ক্যানসার (সার্ভিকাল ক্যানসার, কোলন এবং ফুসফুসের ক্যানসার) হওয়ার সম্ভাবনা কমাতে সাহায্য করে।

দাঁত ও মাড়ির স্বাস্থ্য ঃ ক্যালসিয়াম শৈশব ও যৌবনজুড়ে দাঁতের সুরক্ষা এবং  চোয়ালের হাড়কে মজবুত রাখতে সাহায্য করে। এটি এমন মজবুত দাঁত তৈরি করতেও সাহায্য করে। যেগুলোর মধ্যে ব্যাকটেরিয়া লুকানোর কোনো জায়গা পায় না। পাটের পাতায় ক্যালসিয়াম আছে, যা মাড়ির সমস্যা দূর করে।

ত্বক এবং চুলের স্বাস্থ্য উন্নত ঃ ভিটামিন বি২ কোলাজেনের স্বাস্থ্যকর মাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করে, যার ফলস্বরূপ স্বাস্থ্যকর চুল এবং ত্বক হয়। তাই ত্বক এবং চুলের তারুণ্য বজায় রাখার জন্য কোলাজেন প্রয়োজন। ভিটামিন বি১২ এর ঘাটতির ফলে বয়স্ক চেহারা দেখা যায়। পাট ভিটামিনসমৃদ্ধ।

হাঁপানি বা অ্যাজমা প্রতিরোধ ঃ মানব দেহে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক করতে ম্যাগনেসিয়াম গ্রহণের প্রয়োজন হয় এবং তা হাঁপানি আক্রান্ত মানুষকে শ্বাসকষ্ট এবং শ্বাসকষ্ট থেকে মুক্তি পেতে সহায়তা করবে। পাটের পাতা ম্যাগনেসিয়ামে ভরপুর, যা হাঁপানি প্রতিরোধে বিকল্প ওষুধ হিসেবে কাজ করতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ কমাতে ঃ হাই ব্লাড প্রেসার বা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে পাটশাক দারুণ কার্যকরী। পাট শাকে পটাশিয়াম থাকার কারণে মানব দেহে রক্ত চলাচল করতে সাহায্য করে। এর কারণে দেহের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে ও উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড  প্রেসারের ঝুঁকি কমায়।

পাটের ফার্মাসিউটিক্যাল এবং নিউট্রাসিউটিক্যাল শিল্পে একটি বিকল্প উপাদান হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা আছে। অধিকন্তু তাদের পুষ্টির মূল্যের পরিপ্রেক্ষিতে,  প্রোটিন, ভিটামিন, আয়রন এবং ফোলেটের জন্য মূল্যবান উৎস হিসেবে ব্যবহার করা  যেতে পারে। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, ক্যান্সার, আলসার, ডায়াবেটিস, প্রদাহ, নিউরোইনফ্লেমেশন এবং মাইক্রোবিয়াল সংক্রমণ প্রতিরোধের উপায় হিসেবে পাটের ব্যবহারিকতা মূল্যায়ন করার জন্য আরও সময় উপযোগী ও জনকল্যাণধর্মী গবেষণা প্রয়োজন। তাই এই অর্থনীতি এবং পরিবেশবান্ধব ইস্যুতে ভবিষ্যতে গবেষণার জন্য প্রচুর সুযোগ আছে।

লেখক ঃ ড. জাকারিয়া আহমেদ, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা।

Please Share This Post in Your Social Media

আরো খবর
© All rights reserved ©2021  Daily Andoloner Bazar
Site Customized By NewsTech.Com